করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ কার দায়িত্ব?

ড. মিহির কান্তি মজুমদার

ক’দিন ধরে অনলাইনে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য আসছে। উদ্ধৃতিটি হচ্ছে ‘করোনার সংক্রমণ ঠেকানো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়’। বিভিন্ন মন্তব্যের পাশাপাশি রসিকতা করে এটি কোন্ মন্ত্রণালয়ের কাজ এ নিয়ে পরবর্তী সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় একটি প্রশ্নের রূপরেখাও অনলাইনে ভাইরাল করা হয়েছে। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী কবে, কোথায় এবং কোন্ পরিস্থিতিতে এ কথাটি বলেছেন তা আমি জানি না বা এ সংক্রান্ত কোন সংবাদ আমি দেখিনি। তবে যদি এ কথা বলেই থাকেন তিনি একটি অত্যন্ত সত্য কথা বলেছেন।

আমাদের অধিকাংশ স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকৃতপক্ষে সামাজিক সমস্যা, যা যথাসময়ে নিরসন করা না হলে স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। করোনার সপ্তম প্রজাতির ভাইরাস (ঝঅজঝ-ঈড়ঠ-২), যা সারা বিশ্বে মহামারী আকারে বর্তমানে মহাতাণ্ডব চালাচ্ছে এবং মৃত্যুর মিছিল তৈরি করেছে, এটিও একটি সামাজিক সমস্যা। কোন সামাজিক সমস্যা নিরসন কোন মন্ত্রণালয়ের একার দায়িত্ব নয়। এটি নিরসনে সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায় পর্যন্ত সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বা এ বৈশি^ক মহামারী ঠেকানো এর ব্যতিক্রম কিছু নয়।

অধিকাংশ স্বাস্থ্য সমস্যাকে সামাজিক সমস্যা হিসেবে না দেখণ্ড এটি আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। যেমনটা পেয়েছি চিকিৎসামুখী একটি অস্বাস্থ্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। রোগ হলে চিকিৎসা করাতে হবে- শুধু এটাই আমাদের চিন্তা ও চেতনার মধ্যে আবর্তিত হয়। কিন্তু কি ব্যবস্থা নিলে আমাদের রোগ হবে না বা রোগ কম হবে এবং অল্প খরচে বা বিনা খরচেই রোগ প্রতিরোধ করা যাবে এ চিন্তার মধ্যে আমরা প্রায় নেই। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পরে বিশেষ করে গত এক দশকে আমাদের অগ্রগতি অনেক। স্বাধীনতা লাভের পরপরই এদেশে বৈদেশিক রিজার্ভ ছিল শূন্য, এখন ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। অর্থনীতির আকার ছিল ৮ বিলিয়ন ডলার, এখন ৩৫৩ বিলিয়ন ডলার। সঞ্চয়ের হার ছিল মাত্র ০৩%, এখন ৩০%-এর বেশি। মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১২০ ডলার। এখন ২২২৭ ডলার, যা ভারতের চেয়ে প্রায় ২০০ ডলার এবং পাকিস্তানের চেয়ে প্রায় ৭০০ ডলার বেশি। জিডিপি প্রবৃদ্ধি (করোনা-পূর্ব সময়ে ৮.৩%), গড় আয়ু (৭২.৮ বছর), শিক্ষার হার (৭২.৮%), নবজাতকের মৃত্যু (প্রতি হাজারে ২৮.২ জন), নারী ক্ষমতায়নসহ মানব উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ এখন শুধু এ অঞ্চলের দেশ নয়, পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। কিন্তু উন্নয়নের এ অগ্রগতির পাশাপাশি দ্রæত হারে বাড়ছে আমাদের কিছু মারণঘাতী রোগ। কারণ ঐ সামাজিক সমস্যা, তার কারণ ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে অসচেতনতা এবং অবহেলা।

ভারতকে সে দেশের স্বাস্থ্য গবেষকগণ আখ্যা দিয়েছেন- বিশ্বের ডায়াবেটিকের রাজধানী। আর এক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার সুযোগ্য প্রতিবেশী। ১৯৯৫ সালে এ দেশে জনগণের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার ছিল মাত্র ৪%। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এ্যান্ড হেলথ সার্ভের (ইউঐঝ) প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১১ সালে এ হার ছিল ১১% এবং ২০১৭-এর প্রতিবেদনে তা দাঁড়িয়েছে ১৪%। ডায়াবেটিক রোগীদের প্রায় ৬০% জানেন না তাদের এ রোগ আছে। উচ্চ রক্তচাপ রোগের বৃদ্ধির গতি আরও বেশি। ইউঐঝ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১১ সালে এ রোগের হার ছিল ২৬% এবং ২০১৭ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৪০%-এ। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত নারীদের প্রায় ৫০% এবং পুরুষদের প্রায় ৬৬% জানেন না তাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে। সে কারণে বাড়ছে স্ট্রোক, হৃদরোগ এবং কিডনি রোগ। সমীক্ষা অনুযায়ী স্ট্রোকে আক্রান্তদের প্রায় ৫৪% এবং হৃদরোগীদের প্রায় ৪৭% উচ্চ রক্তচাপ রোগে আক্রান্ত। বিশ্বে কিডনি রোগীর হার ১৩.৪% হলেও বাংলাদেশে এ হার ১৭.৩% এবং এ রোগীদের ৯০% জানেন না তাদের কিডনি রোগ আছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ কিডনি নষ্ট (করফহবু ঋধরষঁৎব) রোগে আক্রান্ত হয় এবং অধিকাংশ রোগী পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত শেষ করে মৃত্যুর মিছিলে শামিল হন। এছাড়া, হেপাটাইটিস, থ্যালাসেমিয়াসহ আরও কিছু রোগের উর্ধগতি আছেই। এসব রোগের কারণ প্রধানত অসচেতনতা ও অবহেলা যা যথাসময়ে সামাজিক সমস্যা নিরসনে গুরুত্ব না দেয়ার একটি নেতিবাচক ফসল।

এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগে আক্রান্তের হার জেনেটিকভাবেই অন্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি। একই সঙ্গে ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম না করা, শর্করা জাতীয় খাদ্য বেশি গ্রহণ করা, বেশি পরিমাণ লবণ ও চিনি খাওয়া, ধূমপান, জীবনযাত্রার পরিবর্তন- সবকিছু এ রোগের বৃদ্ধি মাত্রাতিরিক্তভাবে ত্বরান্বিত করে। আমরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মহাসড়কে উঠেছি, কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করিনি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধের জন্য লকডাউন দিয়েছে, এর মধ্যে প্রায় উৎসব করে আমরা গ্রামের বাড়িতে গিয়েছি। মাস্ক ব্যবহারের জন্য অনবরত অনুরোধ ও নির্দেশনা জারি হচ্ছে, আমরা মাস্ক ছাড়া বা কানে মাস্ক ঝুলিয়ে বীরদর্পে চলাচল করছি। পরিবারের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হয়েছে, কাজেই বাড়ির পাশের খাল-বিল দখল করেছি, নদী, খাল ও রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা ফেলছি। উন্নয়ন এবং আমাদের এসব অভ্যাস দুটোই বেড়েছে একই গতিতে। অথচ একটি বাড়লে অপরটি কমার কথা ছিল। কিন্তু আমাদের কমেনি, কারণ ঐ সামাজিক সমস্যা।

ক’দিন আগে লাতিন আমেরিকার ফুটবল টুর্নামেন্ট ‘ঈঙচঅ অসবৎরপধ’ শেষ হলো। খেলা শেষে দুই প্রতিপক্ষ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার প্রধান খেলোয়াড় লিওনেল মেসি ও নেইমার একে অপরকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ আবেগে কেঁদেছেন। অথচ আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কোপাকুপিতে অনেকে হাসপাতালে ভর্তি। এজন্য হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের দায়িত্ব ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। কিন্তু তার পূর্বের অহেতুক মারামারি কার্যক্রম রোধ করার দায়িত্ব কার? সে কারণে অনলাইনে একটা পোস্ট এসেছিল ‘ঈঙচঅ অসবৎরপধ’-এর ফাইনাল নিয়ে তিনজন মানুষ খুব দুশ্চিন্তায় আছেন। একজন ব্রাজিলের কোচ, একজন আর্জেন্টিনার কোচ এবং তৃতীয়জন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার। আসলেই এ অহেতুক মারামারি ঠেকানোর কাজ কি পুলিশ সুপারের? তার অনেক কাজ আছে। এ কাজে তার থাকার কথা ছিল না, কিন্তু তার অন্য কাজ বাদ দিয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে তাকে। কাজেই আমরা নদী, খাল, রাস্তাঘাটে ময়লা ফেলব আর বলব- মেয়রের দায়িত্ব। নদী, খাল-বিল দখল করব আর বলব- জেলা প্রশাসক বা বিআইডবিøউটিএ বা মেয়র উচ্ছেদ করবেন- তা হয় না। মাস্ক ছাড়া ঘুরে বেড়াব, লকডাউনের মধ্যে উৎসব করে বাড়ি যাব- আর বলব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব- তাও বলা যথাযথ হবে কিনা আমাদেরই ভাবতে হবে। যদিও আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গলদ অনেক। স্কুল হেলথ কর্মসূচী নেই, প্রতিকারের বা চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব খুবই বেশি, প্রতিরোধের ব্যবস্থা খুবই দুর্বল, চিকিৎসক বদলি ও যন্ত্রপাতি কেনকাটায় আমরা যতটা পারদর্শী, গণমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সৃজনে ততটা আগ্রহী নই। এ গলদ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এটি উত্তরাধিকার সূত্রে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে পাওয়া। এ নেতিবাচক উত্তরাধিকার থেকে আমরা বের হতে পারিনি করোনাভাইরাস তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এর থেকে যত দ্রæত বের হতে পারব ততই আমাদের মঙ্গল।